পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের মহিলাদের জন্য একটি বড় উপহার নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে চলেছে। সরকার রাজ্যে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প’ (Annapurna Bhandar Scheme) চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নতুন প্রকল্পটির মাধ্যমে রাজ্যের কোটি কোটি মহিলা লাভবান হবেন। ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে পুরো রাজ্যে এই প্রকল্প কার্যকর হবে।

এই আর্টিকেলে আমরা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের ফর্ম ফিলাপ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, যোগ্যতা এবং সুবিধা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি যদি এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে চান, তবে এই লেখাটি মনোযোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়ুন।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প ২০২৬ কি? (What is Annapurna Bhandar Scheme?)
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে যোগ্য মহিলারা প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে সরাসরি নিজেদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাবেন। অর্থাৎ, মহিলারা বছরে মোট ৩৬,০০০ টাকা আর্থিক সাহায্য পাবেন।
আগে রাজ্যে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প চালু ছিল। নতুন সরকার সেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের জায়গায় এই নতুন ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প’ নিয়ে এসেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে ক্যাটাগরি অনুযায়ী আলাদা আলাদা টাকা দেওয়া হতো। কিন্তু অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ, ওবিসি, এসসি (SC) এবং এসটি (ST) সমস্ত ক্যাটাগরির মহিলারা সমানভাবে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা পাবেন।
জয় বাংলা’ স্ট্যাটাস যাচাই করুন
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য (Key Highlights Table)
আবেদন করার আগে এই প্রকল্পের মূল তথ্যগুলি একনজরে দেখে নিন:
| বৈশিষ্ট্য | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রকল্পের নাম | অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প (Annapurna Bhandar Scheme 2026) |
| রাজ্যের নাম | পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) |
| কারা চালু করেছেন | পশ্চিমবঙ্গ সরকার (নতুন মন্ত্রিসভা) |
| উদ্দেশ্য | মহিলাদের আর্থিক স্বাবলম্বী করা ও সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া |
| মাসিক আর্থিক সাহায্য | ৩,০০০ টাকা প্রতি মাসে |
| বার্ষিক আর্থিক সাহায্য | ৩৬,০০০ টাকা প্রতি বছর |
| টার্গেট উপভোক্তা | রাজ্যের ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী সমস্ত সাধারণ ও সংরক্ষিত শ্রেণীর মহিলা |
| আবেদনের মাধ্যম | অনলাইন পোর্টাল এবং অফলাইন ক্যাম্প |
| টাকা পাওয়ার পদ্ধতি | ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে |
| চালু হওয়ার তারিখ | ১ জুন, ২০২৬ |
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের প্রধান সুবিধা ও লক্ষ্য
সরকার মূলত মহিলাদের নিজস্ব খরচ এবং পরিবারের ছোটখাটো অভাব পূরণের জন্য এই টাকা দিচ্ছে। এই প্রকল্পের প্রধান সুবিধাগুলি নিচে দেওয়া হল:
- আর্থিক স্বাধীনতা: প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা পাওয়ায় মহিলারা নিজেদের ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার বা বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ সহজেই চালাতে পারবেন।
- কোনো বৈষম্য নেই: এই প্রকল্পে সাধারণ জাতি এবং তপশিলি জাতি/উপজাতির মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সব মহিলাই সমান টাকা পাবেন।
- সরাসরি ব্যাঙ্কে টাকা: এই প্রকল্পে কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারী থাকবে না। টাকা সরাসরি আধার লিঙ্কযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে।
- বিনামূল্যে বাস পরিষেবা: এই প্রকল্পের পাশাপাশি সরকার মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধাও অনুমোদন করেছে।
কারা আবেদন করতে পারবেন? (Eligibility Criteria)
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে আবেদন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও যোগ্যতা রয়েছে। এই যোগ্যতাগুলি নিচে দেওয়া হল:
- স্থায়ী বাসিন্দা: আবেদনকারী মহিলাকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- বয়সের সীমা: ১ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে আবেদনকারীর বয়স ২৫ বছর থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
- ভোটার তালিকায় নাম: আবেদনকারী মহিলার নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় থাকা বাধ্যতামূলক।
- চাকরিজীবী হওয়া চলবে না: আবেদনকারী মহিলা কোনো স্থায়ী সরকারি চাকরি করতে পারবেন না। কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের কোনো দফতর, পঞ্চায়েত, পুরসভা বা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মহিলারা এই সুবিধা পাবেন না।
- আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট: মহিলার একটি নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে এবং সেটি অবশ্যই আধার কার্ডের সাথে যুক্ত (Aadhaar Seeding) থাকতে হবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: যাঁরা আগে থেকেই ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের টাকা পাচ্ছিলেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না। তাঁদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে (Automatically) অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। তাঁরা ১ জুন থেকে সরাসরি ৩,০০০ টাকা করে পাবেন। তবে যাঁরা আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাননি, তাঁদের নতুন করে ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। এছাড়া CAA বা ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীরাও এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার পোর্টাল (Annapurna Bhandar Portal)
প্রয়োজনীয় নথিপত্র (Documents Required for Form Fill UP)
নতুন করে ফর্ম ফিলাপ করার সময় নিচের নথিপত্রগুলি সাথে রাখতে হবে:
- আবেদনকারী মহিলার পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি।
- আধার কার্ডের জেরক্স কপি।
- ভোটার আইডি (Voter Card) কার্ডের জেরক্স কপি।
- ডিজিটাল রেশন কার্ড (Ration Card)।
- ব্যাঙ্ক পাসবুকের প্রথম পাতার কপি অথবা ক্যানসেল চেক (যেখানে অ্যাকাউন্ট নম্বর ও IFSC কোড স্পষ্ট দেখা যায়)।
- সই করা সেলফ ডিক্লারেশন বা ঘোষণাপত্র।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার ফর্ম ফিলাপ পদ্ধতি ২০২৬ (Step-by-Step Application Process)
সরকার অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের জন্য অনলাইন এবং অফলাইন দুই ধরনের ব্যবস্থাপনাই রাখছে। আগামী ১ জুন, ২০২৬ থেকে এই ফর্ম ফিলাপ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
১. অনলাইন আবেদন পদ্ধতি (Online Process):
- প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসিয়াল পোর্টালে (যা খুব শীঘ্রই চালু হবে) যান।
- হোম পেজে “Apply for Annapurna Bhandar” লিঙ্কে ক্লিক করুন।
- আপনার সচল মোবাইল নম্বরটি দিন এবং “Generate OTP” অপশনে ক্লিক করুন।
- মোবাইলে আসা OTP দিয়ে ভেরিফিকেশন সম্পূর্ণ করুন।
- এরপর আপনার রেশন কার্ড এবং আধার নম্বর দিয়ে ফর্মটি খুলুন।
- ফর্মে আপনার নাম, ঠিকানা, ব্যাঙ্কের বিবরণ সঠিকভাবে টাইপ করুন।
- সমস্ত প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস স্ক্যান করে আপলোড করুন।
- ফর্মটি ভালোভাবে চেক করে “Submit” বাটনে ক্লিক করুন।
- সাবমিট করার পর অ্যাপ্লিকেশন নম্বর বা অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপটি প্রিন্ট করে নিজের কাছে রেখে দিন।
২. অফলাইন আবেদন পদ্ধতি (Offline Process):
- আপনার নিকটবর্তী সরকারি ক্যাম্প, বিডিও (BDO) অফিস, পুরসভা অফিস বা পঞ্চায়েত অফিসে যান।
- সেখান থেকে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের নির্দিষ্ট ফর্মটি সংগ্রহ করুন।
- ফর্মে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য এবং ব্যাঙ্কের বিবরণ স্পষ্ট অক্ষরে লিখুন।
- ফর্মের সাথে আপনার আধার, ভোটার কার্ড এবং ব্যাঙ্ক পাসবুকের জেরক্স কপি জুড়ে দিন।
- ফর্মে নির্দিষ্ট জায়গায় সই বা টিপছাপ দিন।
- সম্পূর্ণ ফর্মটি ক্যাম্পে বা নির্দিষ্ট আধিকারিকের কাছে জমা দিয়ে রসিদ (Acknowledgement Slip) সংগ্রহ করুন।
গ্রামাঞ্চলে আপনার আবেদনটি বিডিও (BDO) ভেরিফাই করবেন। শহরে মহকুমাশাসক (SDO) এবং কলকাতা পুরসভা এলাকায় পুর কমিশনার আবেদনগুলি যাচাই করবেন। যাচাই পর্ব শেষ হলে আপনার মোবাইলে মেসেজ আসবে এবং টাকা ঢোকা শুরু হবে।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে DBT এবং NPCI লিঙ্ক করা জরুরি কেন?
এই প্রকল্পের টাকা পেতে হলে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটি অবশ্যই NPCI (National Payments Corporation of India) বা আধার সিডিং করা থাকতে হবে। যদি আপনার আধার কার্ডের সাথে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যুক্ত না থাকে, তবে ফর্ম পাস হলেও টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকবে না। তাই ফর্ম ফিলাপের আগেই আপনার নিকটবর্তী ব্যাঙ্ক শাখায় গিয়ে DBT অ্যাক্টিভেশন ফর্ম জমা দিন এবং আধার লিঙ্ক করিয়ে নিন।
হেল্পলাইন নম্বর এবং যোগাযোগ (Helpline Number Table)
আপনার যদি ফর্ম ফিলাপ বা টাকা পাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা থাকে, তবে নিচের মাধ্যমগুলিতে যোগাযোগ করতে পারেন:
| যোগাযোগের মাধ্যম | বিবরণ |
| অফিসিয়াল হেল্পলাইন নম্বর | ১৮০০-৩৪৫-৫৬১৭ (টোল ফ্রি) / সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আপডেট করা হবে |
| ইমেল আইডি | support.wbgov@wb.gov.in (সমস্যার সমাধানের জন্য) |
| অফিস ও ক্যাম্প | নিকটবর্তী দুয়ারে সরকার ক্যাম্প, পঞ্চায়েত বা পুরসভা অফিস |
অফিসিয়াল রেফারেন্স (Official References Table)
প্রকল্পের সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য সবসময় সরকারি ওয়েবসাইট ফলো করুন। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স দেওয়া হলো:
| রেফারেন্স টাইপ | ইউআরএল (URL) লিঙ্ক |
| সামাজিক সুরক্ষা পোর্টাল | https://socialsecurity.wb.gov.in/login |
| পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পোর্টাল | https://wb.gov.in |
উপসংহার (Conclusion)
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প ২০২৬ রাজ্যের মহিলাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী একটি পদক্ষেপ। প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাওয়ার ফলে গ্রামীণ ও শহরের দরিদ্র পরিবারগুলি অনেক স্বস্তি পাবে। ১ জুন ২০২৬ থেকে পোর্টাল চালু হওয়ার সাথে সাথেই আপনারা আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। আপনার আধার কার্ড এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এখনই তৈরি রাখুন। এই আর্টিকেলটি আপনার পরিচিত সমস্ত মহিলাদের সাথে শেয়ার করুন যাতে তারাও এই প্রকল্পের সুবিধা সঠিক সময়ে নিতে পারেন।